কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলে তৈরি নহাটার ভদ্র দালান

ইতিহাস ও ঐতিহ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নিদর্শন

কৃষ্ণ কুমার ভদ্রের পিতা ছিলেন কালী প্রসন্ন ভদ্র। নহাটার সন্তান কৃষ্ণ কুমার ভদ্র তৎকালীন কলকাতা আলীপুর পুলিশ হেডকোর্টারের অধীনে ১৯৩৮ সালে সিভিল সাপ্লাই অফিসার (বর্তমান পুলিশ ইন্সপেক্টর) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভদ্র বাবুরা ছিলেন ৫ ভাই এক বোন। পাশের বাড়ির ডাঃ জয় গোপাল মজুমদারের সাথে বিয়ে হয় একমাত্র বোনের। ডাঃ জয় গোপাল সাহেবের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সর্বমোট এমবিবিএস ডাক্তার ছিলেন ১১ জন। তৎকালে ইট পাথরের ঘরের তেমন একটা প্রচলন ছিল না। কিন্তু কৃষ্ণ বাবু একজন পুলিশ অফিসার হওয়ায় অভিজাত জীবন-যাপনের সাথে অভ্যস্ত ছিলেন। একারণে তিনি ব্রিটিশ আমলে অর্থাৎ, ১৯৩৯ সালে তাঁর পৈত্রিক ভিটায় বসবাসের জন্য ইটপাথরের দৃষ্টিনন্দন ভবন (দালান) নির্মাণের চিন্তা করলেন। তৎকালে এধরণের ভবন নির্মাণের জন্য যেসকল সামগ্রী (ইট,বালু,সিমেন্ট, রড,লোহা) এবং কারিগরের প্রয়োজন হত, তা অবশ্য এ অঞ্চলে দুঃপ্রাপ্য ছিল। নির্মাণ সামগ্রীর অপ্রাপ্যতা থাকলেও ভবন তৈরির নেশা পেয়ে বসেছিল কৃষ্ণ কুমার ভদ্রকে। ফলে সুদূর ভারত থেকে নৌপথে স্টিমার যোগে গৃহনির্মাণ সামগ্রী এবং মিস্ত্রী নিয়ে এসেছিলেন। ভবনটি শান্ত নদী নবগঙ্গার তীরবর্তী হওয়ায় মালামাল নামাতে তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি।

নবগঙ্গা নদীর তীর ঘেষে বাড়ি হলেও ঐতিহ্য রক্ষার্থে সু- বৃহৎ পুকুর কেটেছিলেন ভদ্র সাহেব। ভিনদেশী মিস্ত্রিদের দ্বারা তৈরি ভবনের নকশা এবং কারুকার্য খচিত স্থাপনা ব্রিটিশ স্থাপত্যনিদর্শনের আদলে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন, যা সমকালীন নামীদামী স্থাপত্যবিদের চিন্তাকে হার মানাবে। যতদূর জানা যায়, এ অঞ্চলে তৎসময়ে বিদ্যুতের সুব্যবস্থা না থাকায় ভবনের নকশা এমনভাবে করা হয় যেন,বাধাহীনভাবে ভবনের মধ্যে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস প্রবেশের সুযোগ থাকে।

স্বভাবে উদার প্রকৃতির ভদ্র বাবু দুর্গাপূজার সময় কোলকাতার শিয়ালদহ থেকে খুলনা হয়ে নদীপথে নৌযান যোগে বিভিন্নধরণের পণ্যসামগ্রী নিয়ে আসতেন। ভবনের দক্ষিণ বারান্দায় প্রতি বছর দুর্গাপূজা করতেন তাঁর মা। কোলকাতা থেকে নদীপথে আসার সময়ে তৎকালীন প্রভাবশালী পুলিশ অফিসার হিসেবে নহাটার অদূরবর্তী গঙ্গারামপুর নামক জায়গা থেকে বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছুড়ে জনগণকে তাঁর আগমনী বার্তা জানান দিতেন। তাঁর আগমনী ধ্বনির শুনে সাধারণ জনগণ তাঁর বাড়িতে ভিড় করতেন। এবং দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে অত্র অঞ্চলের হিন্দু- মুসলিম নির্বিশেষে সকলকে দান করতেন তিনি।

উচ্চশিক্ষিত, আভিজাত্য এবং দানশীলতার কারণে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তৎকালীন পূর্ত মন্ত্রী খালেক সাহেব এবং নহাটা ইউপি প্রেসিডেন্ট মোঃ আঃ হামিদ সাহেব ছিলেন তাঁর সহপাঠী। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং বিদ্যোৎসাহী হিসেবে তৎসময়ে নহাটা রাণী পতিত পাবনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন ভদ্র বাবু।পুলিশের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রশাসনিক কাজে কোলকাতায় অবাধে যাতায়াত ছিল ভদ্র সাহেবের। ফলে তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও ধীরে ধীরে কোলকাতায় স্থানান্তরিত হতে থাকেন এবং তৎপরবর্তী কোলকাতায় নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ভদ্র সাহেব তাঁর পৈত্রিক বসতভিটা এবং নিজের তৈরি ভবনের টানে নিয়মিতভাবে আসা যাওয়া করতেন। কিন্তু এই আসা যাওয়ার মাঝে ব্রিটিশ শৃঙ্খল থেকে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে যখন ভারত-পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়, তখন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি প্রায় দেড় যুগ কাল কোলকাতা থেকে আর আসেননি। পতিত ভবনটিতে ১৯৫৭ সাল থেকে সরকারি চিকিৎসক এবং তহসিল অফিসের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হত। তহসিল অফিসের নিরাপত্তায় ব্যবহৃত বন্দুক হারিয়ে যাওয়ায় দপ্তর দু’টি এখান থেকে স্থানান্তরিত করা হয় এবং ১৯৬১ সাল থেকে সরকারি কর্মকর্তা ও চিকিৎসক দের আবাসিক ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে কালের সাক্ষী ভদ্র দালানে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপিত হয়।

উল্লেখ্য, কৃষ্ণ কুমার ভদ্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র স্বপন কুমার ভদ্র ভারতীয় মিত্রবাহিনীর একজন গর্বিত বৈমানিক হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।দীর্ঘদিন পর দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে সর্বশেষ ভদ্র সাহেব তাঁর নিজ বসতভিটায় আসেন। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর ভবনটি অরক্ষিত থাকায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনে ভবনের দরজা-জানালা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জিনিশপত্রের ক্ষতিসাধন করে। ফলে এখনকার জরাজীর্ণ ভবনটির সেই অনন্য সাধারণ নান্দনিক সৌন্দর্য তেমন একটা চোখে পড়ে না। নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভদ্র সাহেবের সহায় সম্পত্তি বিভিন্ন সময়ে মালিকানা হস্তান্তর হলেও বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বুকে ধারণ করে আজও স্ব-গৌরবে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজকের সেই “ভদ্র দালান”। যেটি নহাটা বাজার থেকে এক কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত।

মো: শাহজাহান মিয়া
বেইলি রোড,ঢাকা।
তারিখ : ৭ মে,২০১৯ খৃ:

ছবি: মো: শাহজাহান মিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *