সংগ্রাম ও রোমাঞ্চে ভরা গোলাম কুদ্দুসের অপ্রকাশিত গল্প

মানুষের কথা

পিতা গোলাম শমসের মৃধার ৯ সন্তানের মধ্যে তৃতীয় সন্তান হলেন ব্লাক পার্ল বা কালো মানিক খ্যাত গোলাম কুদ্দুস।জন্ম সন মনে না থাকলেও যুদ্ধের সময় বয়স আনুমানিক ১২-১৩ বছর।দুই মেয়ে এক ছেলে সন্তানের পিতা গোলাম কুদ্দুস বিচিত্র সব পেশার সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যাবস্থায় একসময়ে মানুষের যাতায়াতের অন্যতম বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি, পিতা শমসের মৃধা জীবিকার তাগিদে পেশা হিসেবে ঘোড়ার গাড়ি চালনাকেই প্রধান পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। অভাবের তাড়নায় পড়ালেখা করবার সুযোগ না হওয়ায় পিতার বড় ছেলে হিসেবে বাবার গাড়ি চালনায় মাঝে মধ্যে সঙ্গ দিতে হত গোলাম কুদ্দুসকে।

ঘোড়ার গাড়ি চলানো ছাড়াও ফুটপাতে রুটির দোকান,ঘটি গরম,হাওয়াই মিষ্টি, আইসক্রিম বিক্রি, হাটবাজার,মেলা, পূজাপার্বণে ফেরী করে পান বিক্রি, সামান্য পুঁজি জোগাড় করেই গ্রামে গ্রামে চুরিসূতার ব্যাবসা,এখান থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে ১৩০০ টাকার বিনিময়ে পায়ে ঠ্যালা ভ্যান ক্রয়ের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে গামালী ব্যাবসা,এরপরে পুঁজি একটু বেশী হলেই ফুটপাতে ছাপড়া ঘরে ক্যালেন্ডার, দেশ বিদেশের নেতা_নেত্রী, নায়ক নায়িকাদের ছবি,ভিউ কার্ড,জনপ্রিয় ক্রিকেটার, ফুটবলারদের ছবি, ছবি বাঁধাই,চশমা,মানিব্যাগ,চিরুনি, ঈদকার্ডের ব্যাবসার পাশাপাশি ঘটকালির পেশাতেও নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
এসবের পাশাপাশি খেলাপাগল গোলাম কুদ্দুস ফুটবল,হা-ডুডু এবং ভলিবল খেলতে বেশ পারদর্শী।অত্র এলাকায় খেলা পরিচালনায় রেফারি হিসেবে ব্যাপক সুনাম আছে তাঁর।নির্লোভী, নিরহংকারী, সদালাপী, মিষ্টভাষী,মিশুক প্রকৃতির, অত্যন্ত সৎ,বিনয়ী,নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক গোলাম কুদ্দুস এর প্রধান ধ্যানজ্ঞান নিজে খেলা করা,খেলা পরিচালনা করা,খেলাকে প্রতিষ্ঠা করা।ফুটবল খেলায় গোল কিপার হিসেবে ব্যাপক সুনাম আছে তার।কোন এক জমকালো ফাইনাল খেলায় জাতীয় দলের খেলোয়াড় লোভনের মারা ফ্রি কিক এতটাই শক্তিশালী ছিল যে,বলসহ নিজে জালে জড়িয়ে জান।

১৯৭১ সাল, দেশে তখন টালমাটাল অবস্থা।ঐতিহাসিক নহাটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ক্ষেত্র।পাক সেনারা যুদ্ধ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাঙ্কার খোঁড়ার কাজে এলাকার বেশ ক’জন যুবককে ধরে আনে,তাদের মধ্যে ছিলেন আজকের গল্পের নায়ক গোলাম কুদ্দুস। বিবেকের তাড়নায় পাক সেনাদের সহযোগিতা না করে তাদের দেওয়া রুটি নিয়ে বাঙ্কার খুঁড়া থেকে পালিয়ে যান তিনি। পাক বাহিনীর দেওয়া আগুনে নহাটা বাজার ভস্মীভূত হলে মিলিটারীর অগোচরে আগুন নেভানোর কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি।
ঐ সময়ে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ঘোড়ার গাড়ীতে করে পিতার সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যশোবন্তপুর,জয়ারামপুর আনা নেওয়ার কাজটি করতেন কিশোর গোলাম কুদ্দুস। আহত মুক্তিবাহীনির সদস্যদের বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কাজটিও করেছেন ঘোড়ার গাড়িতে করে।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যয় যেটি তিনি জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন।তখন এরশাদের আমল, কুদ্দুস এলাকার গ্রামে গঞ্জে ব্যাঙ ধরে বিক্রি করতেন।এলাকায় ব্যাঙের ঘাটতি দেখা দেওয়ায়, তার মহাজন তাকে নিয়ে ঢাকার উপকন্ঠে যেমন,ভাগ্যকূল,জয়পাড়া,শ্রীনগর বিক্রমপরে ব্যাঙ ধরতে। বর্ষাকালে চারিদিকে পানিতে টইটুম্বুর, ব্যাঙ ধরে ভাগ্যকূল থেকে জয়পাড়া যাওয়ার পথে বেশ ক’টি বাঁশের তৈরি সাঁকো পার হতে হয় তাকে,পথিমধ্যে কোন এক সাঁকো পার হতে গিয়ে পা ফস্কে তীব্র স্রোতযুক্ত খালের মধ্যে পড়ে যান গোলাম কুদ্দুস ।রাত তখন আনুমানিক ১০ টা।পানিতে অতিমাত্রায় স্রোত থাকায় এবং নিজের কোমরে বস্তায় বাঁধা ব্যাঙ তাকে ভাসাতে ভাসাতে পদ্মা নদীতে নিয়ে যায়।রাত ১০ টা থেকে সুবেহ সাদিক অব্ধি পানিতে ভাসতে থাকেন গোলাম কুদ্দুস। প্রাণ বুঝি যায় যায় ভাব,কোন এক পর্যায়ে দেখেন নদীতে জেলেদের মাছ ধরা ব্যাড় জাল, তাতে প্লাস্টিকের টবের ন্যায় পাত্র বাঁধা, যেটি ধরে নিজেকে সামান্য হলেও রক্ষা করেন তিনি।এক পর্যায়ে জেলেরা ভাবেন আজ নিশ্চয়ই জালে বড় ধরনের কোন মাছ বেঁধেছে!কিন্তু জেলেরা বিস্ময়করভাবে আবিষ্কার করেন মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া গোলাম কুদ্দুসকে।অত:পর তাকে আগুন জালিয়ে, গরম সেক দিয়ে সুস্থ করে নিজ গৃহে পৌঁছাতে সাহায্য করেন জেলেরা।

অল্পে তুষ্ট, মিতব্যয়ী গোলাম কুদ্দুস এর বর্তমান সময় কাটে একবেলা ভ্যান চালিয়ে, অন্য বেলা খেলাধুলা করে।ষাটোর্ধ বয়সী কুদ্দুস এর জীবনে সঞ্চয় বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই।নিরুদ্দেশ হওয়া ছেলে বাদে একমাত্র সহধর্মিণীকে নিয়ে কোনমত দীনহীন জীবন কাটে তার।সে জানেনা আগামী দিনে কোন কারণে ভ্যানের প্যাডেল না ঘুরলে সংসার চলবে কেমন করে!

মোঃ শাহজাহান মিয়া
নহাটা, মহম্মদপুর মাগুরা।
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *